বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৯ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম: বরিশাল সিটি করপোরেশনের অনুকূলে অর্ধশত কোটি টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল বাকি রয়েছে। এজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ বরিশাল নগরের সড়ক বাতিসহ পানির পাম্পের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। যদিও বর্তমান পরিষদ গোটা বকেয়ার দায় নিতে রাজি নয়। কারণ প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সময়কালে ২০ কোটির অধিক বকেয়া বিল রয়েছে। এবং সাবেক প্রয়াত মেয়র আহসান হাবিব কামালের মেয়াদকালে নতুন বকেয়া ২১ কোটি ৭৪ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩৯ টাকা নিয়ে মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ কোটি। এরফলে বিসিসির ৪২ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়ার দায় নিতে রাজি নয় বর্তমান পরিষদ। তবে নগরবাসীর ভোগান্তি লাঘবে সংযোগ বিচ্ছিন্নের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ।
এদিকে, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় বরিশাল নগরীর সড়কবাতির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। বুধবার সন্ধ্যায় (২১ সেপ্টেম্বর) নগরীর কালিবাড়ী রোডে সেরনিয়াবত ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
মেয়র সাদিক সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা ও চলমান এসএসসি পরীক্ষার সময়ে সড়ক বাতির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় নগরবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
মেয়র সাদিক বলেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের বকেয়া নিয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সাথে তার কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে প্রতিমন্ত্রী ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে বলেছেন। কীভাবে সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত হচ্ছে তা সকলেরই জানা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, “বকেয়ার জন্য সড়ক বাতি ও পানির সংযোগ বন্ধ করে দেয়া দুঃখজনক।” বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য নিজের বাসা, দপ্তর এমনকি সিটি কর্পোরেশন ভবনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারত জানিয়ে মেয়র বলেন, জনগণকে জিম্মি করে তাদের ভোগান্তিতে ফেলার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না, বলেন মেয়র। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানানো ছাড়া আর কিছু করার নেই বলে মেয়র উল্লেখ করেন।
মতবিনিময় সভায় মেয়র সাদিক জানান, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের থেকে অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার কাছে বেশি বকেয়া রয়েছে। শুধুমাত্র বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।
বর্তমান পরিষদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী- বরিশাল সিটি করপোরেশনের অনুকুলে মোট ১১২টি বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। যার অনুকূলে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত টানা তিন পরিষদ ধরে সারচার্জসহ মোট বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে ৫৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এরমধ্যে সাবেক মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের সময়কালে অর্থাৎ জুন ২০১৩ পর্যন্ত ২০ কোটি ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার ১৫ টাকা বকেয়া ছিল। যার এক টাকাও সেই পরিষদ পরিশোধ করেনি। এরপরে অক্টোবর ২০১৮ পর্যন্ত সাবেক মেয়র প্রয়াত আহসান হাবিব কামালের মেয়াদকালে নতুন বকেয়া ২১ কোটি ৭৪ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩৯ টাকা নিয়ে মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ কোটি ১১ লাখ ২৯ হাজার ৮৮ টাকা। যদিও ওই পরিষদ ১ কোটি ৩৩ লাখ ২৮ হাজার ১২২ কোটি টাকা পরিশোধ করে। এর পরবর্তীতে নভেম্বর ২০১৮ থেকে এখন পর্যন্ত বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর আমলে নতুন বকেয়া ১৫ কোটি ৮ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ টাকা নিয়ে মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৭ কোটি ১৯ লাখ ৭৭ হাজার ১৪৯ টাকা। বর্তমান পরিষদের দাবি, তাদের আমলে প্রতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের বিলের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত বর্তমান মেয়রের আমলে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৭০ হাজার ২০৭ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। যা এ যাবৎকালে কোনো মেয়রের আমলে সর্বোচ্চ।
মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বলেন, জনগণ আমার প্রতি খুশি, তাদের অখুশি করার জন্য এমনটা হতে পারে। লোকাল ফান্ডের টাকা দিয়ে কর্মচারী বেতন ও উন্নয়নমূলক কাজ করতে হচ্ছে, তবে সরকারি প্রজেক্টের টাকা আসলে এতো বিদ্যুৎ বিল দেওয়া ব্যাপার ছিল না। তারপরও বলেছি আমি চলে যাওয়ার আগে যতটুকু পারি পরিশোধ করে যাবো। তিনি বলেন, আমাকে ২৫ কোটি টাকা দিতে বলা হচ্ছে, কিন্তু আমার সময় এ ২৫ কোটি টাকার বকেয়াই তো হয় নাই। আগের মেয়রদের সময়ের বকেয়া তারা কেন আদায় করেননি। তখন যে টাকা করপোরেশনের আয় হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে সেই বিলগুলো দেওয়ার কথা ছিল। আমি শপথ নেওয়ার পর থেকে দায়-দায়িত্ব নিতে পারি, তার আগেরটা তো আমার না।
বিসিসির প্যানেল মেয়র গাজী নঈমুল হোসেন লিটু বলেন, কোনো কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করে এভাবে সড়ক বাতি ও পানির পাম্পের বৈদ্যুতিক লাইনের সংযোগ কেটে দেওয়া হলো। নগরাবাসীকে এভাবে দুর্ভোগে ফেলাটা আমরা মনে করি সেচ্ছাচারিতা ও হটকারী সিদ্ধান্ত। বকেয়া যে শুধু বরিশাল সিটি করপোরেশনের রয়েছে এমনটা নয়, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, গাজীপুর, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনেরও কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। কিন্তু তাদের অবস্থা তো আমাদের মতো হয়নি। ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদের সই করা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এক সভার রেজুলেশনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন- সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে সব পৌরসভার বকেয়া বিদ্যুৎ বিল রয়েছে তা পরিশোধ না করলে সড়কবাতি ব্যতিত অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা। এছাড়া ওই রেজুলেশনে বলা হয়েছে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন বকেয়া বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধ না করতে পারলে কিস্তিতে পরিশোধ করার কথা এবং প্রয়োজনে সারচার্জ মওকুফের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের নিকট প্রস্তাব দিলে মওকুফের ব্যবস্থা করার কথা। যার কোনটিই মানেনি স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
নগর ভবনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বলেন, ১২ সেপ্টেম্বর আমাদের একটি চিঠি দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। নগর ভবনের কাছে বিদ্যুৎ বিল বাবদ পাওনা ৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করতে বলা হয় চিঠিতে। অন্যথায় সংযোগ বিচ্ছিন্নের সর্তকতা দেয় তারা। ১৫ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার তাদের ৭৮ লাখ টাকার একটি চেক দেই আমরা। পর্যায়ক্রমে বাকি বকেয়া পরিশোধের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর চেক ক্যাশ করে টাকা নেওয়ার পরপরই সড়ক বাতি এবং পানির পাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা শুরু করে তারা।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে- সিটি করপোরেশনের কাছে ওজোপাডিকোর প্রায় ৫৯ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিমান বাড়ছে, গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে শতাধিক চিঠি দিয়েও এর সমাধান হয়নি। বকেয়া টাকা আদায় না হওয়ায় তারা শহরের মাত্র ১৫ টি সড়কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply